ময়মনসিংহের তারাকান্দায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে কলেজছাত্র শাহীনুর আলম ওরফে ইকবাল (১৯) হত্যা মামলায় সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত| একই সঙ্গে মামলার অন্য দুই নারী আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে|
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ময়মনসিংহের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন জনাকীর্ণ আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন| দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রায় প্রদান করলেন|
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— মো. ইউনুছ আলী ওরফে ইন্নছ আলী, মোহাম্মদ আলী, মো. গোলাম হোসেন ওরফে গুলু, শামছুল হক, আসিফ রানা নাঈম, মো. আব্দুল হেলিম ও মো. ফরিদ আহম্মেদ ওরফে বাবু|মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে|
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের তথ্য গোপন ও সহযোগিতার দায়ে মোছা. খালেদা আক্তার ও মোছা. রেহেনা খাতুনকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে| জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও এক বছরের অতিরিক্ত সাজা ভোগ করতে হবে|

নিহত শাহীনুর আলম ইকবাল ময়মনসিংহ নগরীর রুমডো পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন| মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩১ মে রাতে তারাকান্দার পলাশকান্দা টানপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের একটি চায়ের দোকানে যায় ইকবাল|
এরপর তিনি আর বাড়ি ফিরে আসেননি| নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ৫ জুন গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের নিচে পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে তাঁর গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ| ওই ঘটনায় পরদিন ৬ জুন ইকবালের ভাই সেলিম মিয়া বাদী হয়ে প্রতিবেশী আসিফ রানা নাঈমসহ অন্যদের বিরুদ্ধে তারাকান্দা থানায় হত্যা মামলা করেন|
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) এডভোকেট আনোয়ার আজিজ টুটুল মামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, জমি নিয়ে পূর্ববিরোধের জেরে সুপরিকল্পিতভাবে ইকবালকে হত্যার পর লাশ গুম করতে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল| মানুষের সন্দেহ এড়াতে এবং লাশের গন্ধ আড়াল করতে আসামিরা মরদেহের ওপর মরা শিয়াল ও গোবর ফেলে সেখানে গাছ লাগিয়ে দিয়েছিল|
আদালত ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং দীর্ঘ যুক্তি-তর্ক শেষে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় আসামিদের এই কঠোর দণ্ড প্রদান করেছেন| এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট আনোয়ার আজিজ টুটুল।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও ইকবালের বড় ভাই সেলিম মিয়া| রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমার ভাইকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল যা কল্পনা করাও কঠিন| আমরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই রায়ে সন্তুষ্ট|
আমাদের এখন একমাত্র দাবি, উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল থাকে এবং দ্রুত যেন আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়| এদিকে রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সাতজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে| অন্যদিকে ইকবালের সহপাঠী ও এলাকাবাসী এই দৃষ্টান্তমূলক রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন| আসামি পক্ষের আইনজীবী ছিলেন এডভোকেট এ এইচ এম খালেকুজ্জামান।