মাথায় বাঁশের ঝুড়ি, পরনে সাধারণ পুরাতন প্যান্ট, লুঙ্গি-গেঞ্জি আর হাতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানোর 'কারু' (খড় দিয়ে তৈরি সরঞ্জাম)। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া মৌয়ালদের চিরচেনা রূপ এটি। সুন্দরবন উপকূল সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে এখন খলিশা আর গরান ফুলের সুবাস। এই সুবাসের টানেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মৌয়ালরা ছুটে যান বনের গভীরে। তবে এবারের মধু আহরণ মৌসুমে বাঘের ভয়ের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে 'পাস' আতঙ্ক। একদিকে সরকারি রাজস্ব দিয়ে বন বিভাগের 'পাস', অন্যদিকে বনের ভেতরে অস্ত্রধারী দস্যু বা তাদের এজেন্টদের দেওয়া 'টোকেন'। এই দ্বিমুখী খাজনার চাপে পিষ্ট উপকূলের হাজারো মৌয়াল।
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে বাঘের গর্জন শুনলে মৌয়ালরা সাবধান হন, গাছের ডালে ওঠেন কিংবা দলবদ্ধ হয়ে আত্মরক্ষা করেন। কিন্তু বনের ভেতরে যখন নিঃশব্দে ভেসে আসে দস্যুদের নৌকা, তখন আত্মরক্ষার কোনো পথ থাকে না। সুন্দরবনের উপকূলে এখন এক নির্মম প্রবাদ চালু হয়েছে—"বাঘে ধরলে একবার মরে, আর দস্যু ধরলে তিল তিল করে মরে।" সরকারি ‘পাস’ নিয়ে বনে ঢুকেও মৌয়ালদের জীবন এখন বিষিয়ে তুলেছে বনদস্যুদের সমান্তরাল ‘টোকেন রাজত্ব’।
'দস্যু আতঙ্ক ও ঋণের জালে বিপন্ন মৌয়াল জীবন:
পাশের শুরতে দস্যুদের সমঝোতা না হওয়ায় দেরিতে যাওয়া এক মৌয়াল আঃ হামিদ বলেন, সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে যাওয়ার প্রধান বাধা এখন বনদস্যুদের চাঁদা। দস্যুদের সাথে ‘সমঝোতা’ করতে দেরি হওয়ায় মৌয়ালদের আনা রসদ নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে উদ্বেগ। বন বিভাগের অনুমতি থাকলেও নিরাপত্তার অভাবে মৌয়ালরা সবসময় অপহরণ ও মারধরের আতঙ্কে থাকেন।
আরেকজন মৌয়াল হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমাগো কপালডা খারাপ। মধু তুলতে যাব, কিন্তু আগে দস্যুদের ভাগ দিয়া নিতে হয়। না দিলে জিনিসপত্র লইয়া যাবে, মারধরও করবে।”
মহেশ্বরীপুর এলাকার এক অভিজ্ঞ মৌয়াল আঃ রহিম জানান, “আগে ভয় আছিল বাঘের, এখন ভয় দস্যুর। বাঘের থেইকা বাঁচার উপায় আছে, কিন্তু দস্যুদের হাত থেইকা বাঁচার উপায় নাই।”
মূল পরিস্থিতি:
নিরাপত্তাহীনতা:৷ চাঁদা না দিলে দস্যুরা মধু কেড়ে নেয় এবং মুক্তিপণ দাবি করে।
বাধ্যবাধকতা: পরিবারের অমত থাকা সত্ত্বেও মহাজনের দাদনের টাকা শোধ করতে মৌয়ালরা জীবন বাজি রেখে বনে যাচ্ছেন।
মহাজনি তদারকি: সবদিক ‘ম্যানেজ’ করার আশ্বাস দিয়ে এবং যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে মহাজনরা আল্লাহর নাম নিয়ে মৌয়ালদের বনে পাঠাচ্ছেন।
ঘাটে দাঁড়িয়ে মহাজন রফিকুল জানান, তিনি মৌয়ালদের সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছেন। নৌকায় সাতজন মৌয়াল যাচ্ছেন। মধু আহরণের পর মোট উৎপাদন আট ভাগে ভাগ হবে-সাত ভাগ মৌয়ালদের, এক ভাগ তাঁর। মৌয়ালদের দেওয়া পুঁজি মধু বিক্রির পর ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজের অংশের মধু বা তার মূল্য পাবেন। তিনি বলেন, 'এবার দস্যুদের অতিরিক্ত চাঁদাবাজির কারণে খরচ অনেক বেড়েছে।
লাভ হবে কি না চিন্তায় আছি।'
সুন্দরবন দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মধুর উৎস। প্রতিবছর এপ্রিল ও মে-এই দুই মাস মৌয়ালরা বনে ঢুকে মধু সংগ্রহ করেন। চলতি বছরও ১ এপ্রিল থেকে মৌসুম শুরু হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু ও ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু সাঈদের মতে, সুন্দরবনে বর্তমানে ৫-৬টি দস্যুদল সক্রিয়, যারা নৌকাপ্রতি লাখ টাকার বেশি চাঁদা দাবি করছে। একেকটি দল মৌয়ালপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে নেওয়ায় সাতজনের একটি নৌকাকে শুধু একটি দস্যুদলকেই ৪২ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। দস্যুদের এমন দফায় দফায় চাঁদাবাজির চাপে অনেক মৌয়াল পাস নিয়েও বনে ঢুকতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।
রক্ত জল করা মধুতে দস্যুদের ভাগ:
মৌসুমের শুরুতে হাজারো মৌয়াল ধারদেনা করে, মহাজনের দাদন নিয়ে সুন্দরবনে পাড়ি জমান। কিন্তু বনের গহীনে তাদের জন্য ওত পেতে থাকে অদৃশ্য এক আতঙ্ক। বন বিভাগের বৈধ পাস থাকার পরও প্রতিটি নৌকাকে গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকার ‘অবৈধ টোকেন ফি’।
গতকাল শনিবার বনের ভেতর থেকে ফিরে আসা কয়রা অঞ্চলের এক প্রবীণ মৌয়াল তাঁর ক্ষতবিক্ষত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন: "বাঘের থাবা দেখা যায়, ওই ভয় সয়ে গেছে। কিন্তু এই দস্যুদের টোকেন বিষের মতো। একবার দিতে না পারলে ওরা নৌকা আটকে রাখে, মধু আর জাল ছিনিয়ে নেয়। পাস দেখালে হাসাহাসি করে বলে—‘সরকারের পাস দিয়ে শহরে গিয়ে মধু বেচো, বনে থাকতে হলে আমাদের পাস লাগবে।’ আমাদের রক্ত জল করা মধুতে ভাগ বসানো এই দস্যুরা বাঘের চেয়েও বিষাক্ত ভয়ঙ্কর।"
বিষাক্ত এই ‘টোকেন’ প্রথা আসলে কী?
মৌয়ালদের ভাষায়, এটি এক ধরণের ‘ছায়া কর’। বনের ভেতরে সক্রিয় ছোট ছোট সশস্ত্র গ্রুপ বা দস্যুরা মৌয়ালদের নৌকা আটকে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দাবি করে। টাকা দিলে মেলে একটি বিশেষ সাংকেতিক কাগজ বা স্লিপ, যা এলাকায় ‘টোকেন’ নামে পরিচিত।
মৌয়ালদের দ্বিমুখী সংকট:
সরকারি পাস: বন বিভাগকে রাজস্ব দিয়ে সংগৃহীত বৈধ অনুমতিপত্র।
দস্যু টোকেন: জীবনের নিরাপত্তা কিনতে দস্যু বাহিনীকে দেওয়া বাধ্যতামূলক চাঁদা।
দক্ষিণ বেদকাশি থেকে আসা এক তরুণ মৌয়াল আক্ষেপ করে বলেন: "বাঘের ভয় অমঙ্গল, কিন্তু দস্যুদের ভয় মরণ। টোকেন না নিলে গহীন বনের ভেতরে মানুষ নিখোঁজ করে দেয়। বাঘের থাবায় শরীর ছিঁড়ে যায়, আর এদের টোকেনের তাড়নায় আমাদের সংসার তছনছ হয়ে যায়।"
পাস বনাম টোকেন: জীবন যেখানে দুই কূলে বাধা:
কয়রা কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে পাস নিয়ে বনে ঢুকেছিলেন আজিজুল । তিন দিন পর বন থেকে ফিরে এসে তিনি শোনালেন এক রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা। আজিজুল বলেন:"ফরেস্ট অফিস থেকে পাস নিতে সরকাররে টাকা দিছি। মনে করছিলাম এবার নিশ্চিন্তে মধু কাটব। কিন্তু হাড়বাড়িয়া পার হতেই ছোট নৌকায় দুই যুবক এসে পথ আটকাল। তারা কোনো কথা শোনার আগেই বলল- 'বড় ভাইয়ের টোকেন কই?' টোকেন ছাড়া মধু কাটা তো দূরের কথা, নৌকার নোঙর ফেলতেও দেবে না। শেষমেশ ধারদেনা করে আনা টাকার একটা বড় অংশ তাদের হাতে দিয়ে জীবন বাঁচিয়ে যাচ্ছিলাম মধু আহরনে। পথে আরেক দলের হাত থেকে বাঁচতে রাতে ভুল পথে চলে যাই নিষিদ্ধ এলাকায়। গেছি যখন দেখি মধু হয় কিনা কোন রকমে ৩ কেজির মত মোম হয়েছে সেটা নিয়ে বেরিয়ে আসতে পড়লাম কোষ্টগার্ডের হাতে। পাশ দেখালাম বললাম ডাকাতের ভয়ে ভুলে চলে এসেছি ছেড়ে দেন তবুও শেষ রক্ষা হল না। নলিয়ান থেকে এনে দিল কয়রা কোর্টে সেখান থেকে মামলা জামিনে আছি কিন্তু দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে বসে আছি পাশ ও নৌকা এখনও কোর্টের হাতে। দেখি আগামী সপ্তাহে জামিন হলে আবার যাব মধু কাটতে।
মৌয়ালদের আক্ষেপ:
"আমরা হলাম বাঘের মুখের খাবার। বাঘের সাথে লড়াই করে মধু আনি। কিন্তু বনের ভেতরে যারা 'টোকেন' বিক্রি করে, তারা বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর। বন বিভাগরে টাকা দিলে কাগজ দেয়, আর দস্যুগের টাকা দিলে একটা সাংকেতিক চিরকুট বা টোকেন দেয়। ওই কাগজ না থাকলে নৌকা ধরে নিয়ে যায়, মারধর করে।"
'টোকেন' না থাকলে মুক্তি নেই:
খুলনার কয়রা এলাকা থেকে আসা এক তরুণ মৌয়াল জানান, বনের ভেতর মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলেও দস্যুদের নেটওয়ার্ক খুব শক্তিশালী। তিনি বলেন: "ওরা জানে কোন খালে কয়টা নৌকা ঢুকছে। পাস থাকলেও ওরা বলে- 'সরকারের পাস দিয়ে ডাঙায় চলবা, বনে চললে আমাদের টোকেন লাগবে।' টোকেন না নিলে মধু তো কেড়ে নেয়ই, অনেক সময় লোক তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে।"
মৌয়ালরা বলছেন, দস্যুদের দাবি করা অর্থ স্থানীয় কিছু ঁমধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। এই প্রক্রিয়া অনেকটাই গোপনে পরিচালিত হয়। তবে শুধু মধু আহরণ নয়, মাছ ধরা বা কাকড়া ধরার জন্য বনে ঢুকতেও নৌকাপ্রতি দস্যুদের চার হাজার টাকা দিতে হয়। তবে স্থানীয় সহযোগীদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহী তারা।
এবার অল্প যে কয়েকটি নৌকা দস্যুদের দাবি করা অর্থ পরিশোধ করে সুন্দরবনে ঢুকতে পেরেছে, তেমনই একটি নৌকার পেছনে অর্থ লগ্নি করেছেন কয়রার আনারুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'এবার ১৪ দিনের জন্য একটি নৌকায় ৭ জন মৌয়াল পাঠাতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অন্য বছর যেখানে খরচ হতো দেড় লাখ টাকা, সেখানে এবার দস্যুদের চাপের কারণে খরচ বেড়েছে। তা-ও সব দস্যু বাহিনীকে টাকা দিতে পারিনি। যাদের দিইনি, তাদের সামনে পড়লে আবার আলাদা করে টাকা পাঠাতে হবে।'
কয়রার পল্লীমঙ্গল গ্রামের অজিয়ার শেখ এবারই প্রথম মধু আহরণের একটি নৌকায় টাকা লগ্নি করেছেন। তিনি জানান, আগে শুনেছিলেন মধু ব্যবসা লাভজনক, তাই বাড়ি বসেই একটি ভাগ পাওয়ার আশায় বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বিপাকে পড়েছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য:
তবে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড দস্যু তৎপরতার বিষয়টি অস্বীকার করছে না। পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) জানান, মৌয়ালদের নিরাপত্তা দিতে বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। র্ াব ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে গত ১ এপ্রিল মধু মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন,"বনদস্যুরা স্থানীয়দের আশপাশেই ঘাপটি মেরে আছে। তাদের দমনে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। দস্যু দমনে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো বনজীবীকে জিম্মি হতে দেওয়া হবে না।"
পর্যবেক্ষকদের অভিমত:
উপকূলীয় অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের মধুকে কেন্দ্র করে হাজারো পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। দস্যু আতঙ্ক দূর করতে না পারলে শুধু উৎপাদনই কমবে না, উপকূলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধস নামবে। মৌয়ালরা চান, সরকার যেন 'দস্যুমুক্ত সুন্দরবন' স্লোগানটিকে স্রেফ খাতায়-কলমে না রেখে বাস্তবে রূপ দেয়।