ইসরায়েল-ইরান সংঘাতকে ঘিরে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন দেশীয় রাজনীতিতে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে তাকে এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে যে সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তিনি তৈরি করেছিলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর তার বেশ কয়েকটি প্রধান লক্ষ্য অপূর্ণই থেকে গেছে।
নেতানিয়াহুর প্রধান ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন বলছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট রয়েছে এবং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) রাজনৈতিকভাবে আরও সংগঠিত অবস্থানে আছে।
এছাড়া, যে ‘শাসন পরিবর্তন’ বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আশা ইসরায়েলি মহলের একাংশ প্রকাশ করেছিল, মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণ শুরু থেকেই সেটিকে অবাস্তব বলে মনে করেছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই মূল্যায়নকেই অনেকটা সমর্থন করেছে।
ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা Yair Lapid যুদ্ধবিরতিকে একটি “কূটনৈতিক বিপর্যয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময় ইসরায়েল কার্যত আলোচনার টেবিলে ছিল না। একই ধরনের সমালোচনা এসেছে বামপন্থি রাজনৈতিক মহল থেকেও।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু নিজে বলেছেন যুদ্ধবিরতি “যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি বিরতি।” তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনে যে কোনো সময় ইসরায়েল পুনরায় সামরিক অভিযানে ফিরতে প্রস্তুত।
যুদ্ধবিরতি ইরানকে ঘিরে হলেও লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা এখন নেতানিয়াহুর জন্য একটি নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আগের আন্তর্জাতিক সমালোচনার কারণে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি আগেই চাপে ছিল। তার ওপর ইরান ইস্যুতে অস্পষ্ট ফলাফল নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আসন্ন নির্বাচনের বছরে এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তার দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রমও পুনরায় শুরু হচ্ছে, যা রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা বয়ান তিনি তৈরি করেছিলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতির পর সেই বয়ানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ইরান যুদ্ধবিরতির পর নেতানিয়াহুর সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে অসমাপ্ত সামরিক লক্ষ্য, অন্যদিকে ঘরোয়া রাজনৈতিক সমালোচনা। এই পরিস্থিতি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।