খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখন সজনের সমারোহ। একসময় যে জমিতে নোনা জলের ভয়ে ঘাস ছাড়া কিছুই জন্মাত না, সেখানে এখন ঝুলে আছে হাজারো সজনে ডাঁটা। খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার প্রতিটি গ্রাম এখন সজনের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। কোনো প্রকার যত্ন ছাড়াই পরিত্যক্ত ও পতিত জমিতে সজনে চাষ করে অভাবকে জয় করে বাড়তি আয়ের নতুন দিশা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। নোনা মাটির এই 'যাদুকরী' সবজি এখন কয়রার মানুষের কাছে 'সবুজ সোনা' হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। অবহেলিত এই সবজি এখন কয়রার গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
কৃষকের মুখে সাফল্যের গল্প:
উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান ঢালী নিজের বাড়ির পেছনের ১৫ শতাংশ পতিত জমিতে সজনে গাছ লাগিয়েছেন। তিনি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেন, "আগে এই জায়গাটা জঙ্গল হয়ে থাকত। সাপের ভয়ে কেউ যেত না। বউয়ের পরামর্শে কয়েকটা ডাল পুঁতেছিলাম, এখন দেখি গাছ ভরে সজনে। কোনো সার-বিষ লাগে না, অথচ বাজারে বিক্রি করে এবার ১০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।"
একই এলাকার নারী উদ্যোক্তা সুফিয়া বেগম জানান তার অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, "বাড়ির আঙিনায় ৫টি গাছ লাগিয়েছি। পরিবারের খাওয়া তো হচ্ছেই, পাড়া-প্রতিবেশীদের দিয়েও গত সপ্তাহে ২ হাজার টাকার সজনে বিক্রি করেছি। অভাবের সংসারে এটা আশীর্বাদের মতো।
উত্তর বেদকাশি গ্রামের চাষি মোজাম্মেল হক বলেন, "লবণাক্ততার কারণে আমাদের এখানে অন্য সবজি ফলানো কঠিন। কিন্তু সজনে গাছ একবার ধরলে আর মরে না। ঝড়ে ডাল ভাঙলেও আবার নতুন করে কুঁড়ি গজায়। এটি আমাদের মতো উপকূলীয় মানুষের জন্য সেরা ফসল।”
কেন সজনেই বাজিমাত?
কয়রা উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় সজনের বাম্পার ফলন হয়েছে। স্থানীয় জাতের পাশাপাশি অনেক কৃষক এখন বারোমাসি জাতের সজনে চাষে ঝুঁকছেন।
বিশেষত্ব : কৃষকের সুবিধা
খরচ : শূন্য বললেই চলে; বীজ বা ডাল রোপণ করলেই হয়।
যত্ন :নিড়ানি বা সেচের বাড়তি প্রয়োজন হয় না।
বাজার : সিজন শুরুর আগে প্রতি কেজি ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
প্রতিরোধ : নোনা মাটি ও খরা সহনশীল।
অর্থনীতির নতুন দিগন্ত:
কয়রা সদর বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা হারুনুর রশীদ জানান, "আগে সজনে আসত যশোর বা কুষ্টিয়া থেকে। এখন কয়রার সজনে গ্রাম থেকে তুলে সরাসরি ট্রাকে করে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাচ্ছে। চাহিদা এত বেশি যে আমরা জোগান দিয়ে পারছি না।" সজনের পাতা এখন শুকিয়ে গুঁড়ো (Superfood) হিসেবে বিক্রি করার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। এতে করে শুধু ডাঁটা নয়, পাত থেকেও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা:
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, "আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি যাতে একটি জমিও খালি না থাকে। সজনে চাষে খরচ নেই বললেই চলে, কিন্তু এর পুষ্টিগুণ ও বাজারমূল্য আকাশচুম্বী। বিশেষ করে লোনা পানিতে টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে উপকূলীয় কৃষিতে সজনে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে এসেছে।”
পরিবেশবিদদের মতে, সজনে চাষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, পরিবেশগতভাবেও কয়রাকে সুরক্ষা দিচ্ছে। মাটির ক্ষয় রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই গাছ বিশেষ ভূমিকা রাখছে। পতিত জমি থেকে এই বাড়তি আয় এখন উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দিচ্ছে।
বদলে যাওয়া জীবনচিত্র:
কয়রা উপজেলার নোনা মাটিতে কৃষিকাজ করা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু সজনে চাষে সেই ঝুঁকি নেই। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি-কোনো কিছুই সজনের ফলনে বাধা হতে পারছে না।
উপজেলার কালনা গ্রামের গৃহিণী রাবেয়া খাতুন বলেন, "বাড়ির উঠানে তিনটে গাছ আছে। নিজেরা প্রতিদিন খাই, আত্মীয়দের বাড়িতেও পাঠাই। এরপরও যা বাঁচে, বাজারে বিক্রি করে ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ উঠে আসে। বাড়ির কোণে পড়ে থাকা জমি যে টাকা দেবে, তা ভাবিনি কোনোদিন।”
বাজার ও সম্ভাবনা:
স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে কয়রার সজনে এখন ট্রাকবোঝাই হয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে। কয়রার বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. আল আমিন বলেন, “কয়রার সজনে বেশ পুষ্ট আর খেতে সুস্বাদু। তাই পাইকারি বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে আমরা কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় সংগ্রহ করছি, যা বড় শহরে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।”
কৃষি বিভাগ বলছে, সজনে এখন আর কেবল সবজি নয়, এর পাতা থেকে তৈরি 'সুপারফুড' পাউডার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের পরিকল্পনা চলছে।
কৃষি বিভাগের পর্যবেক্ষণ:
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজান মাহমুদ বলেন: "কয়রায় লোনা মাটির কারণে চাষযোগ্য জমির সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আমরা কৃষকদের পতিত জমি বা বাড়ির আঙিনায় সজনে চাষে উদ্বুদ্ধ করেছি। এটি খরচহীন একটি লাভজনক ফসল। এ বছর কয়রার প্রায় প্রতিটি ঘরেই সজনের ফলন হয়েছে, যা পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখছে।”
এক নজরে কয়রার সজনে চাষ
চাষ পদ্ধতি: : কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।
লাভ: : পতিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং স্বল্প সময়ে অধিক আয়।
চাহিদা : রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সজনের পুষ্টিগুণের কারণে বাজারে ব্যাপক চাহিদা।
উপকূলীয় এই জনপদে সজনে চাষ কেবল একটি কৃষি কাজ নয়, এটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার এক সফল লড়াই। কয়রার কৃষকদের এই নীরব বিপ্লব প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনায় পরিত্যক্ত জমিও হয়ে উঠতে পারে আয়ের প্রধান উৎস।
ফুল থেকে লকলকে কচি ডাঁটা যখন বাজারে ওঠে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। তবে যখন পরিপুর্ণ বাজারে আসে তখন দাম কমে যায়। বর্তমানে বাজারে ৮০ - ৫০ টাকা কেজি দরে সজনে ডাঁটা বিক্রি হচ্ছে। এবার প্রাকৃতিক ঝড়-ঝাপটা না হওয়ায় প্রতিটি গাছে ফলন এসছে প্রচুর। সজনে উৎপাদনে চাষিদের কোন খরচ হয়না। ফলে গাছ থেকে যতটুকু সজনে ডাঁটা উৎপাদিত হয় তার সবটুকুই চাষির লাভ।
তবে উপজেলায় কত হেক্টর জমিতে সজনের গাছ আছে তার সঠিক হিসেব কৃষি বিভাগের নাই।
বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ:
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে সজনে চাষে ঝুঁকছেন। অনাবাদি জমি, পুকুরপাড় কিংবা বাড়ির ফাঁকা জায়গা-সবখানেই লাগানো হচ্ছে সজনে গাছ। একজন অভিজ্ঞ কৃষক বলেন,"কম খরচ, কম পরিশ্রম-কিন্তু আয় ভালো। তাই সজনে এখন লাভজনক ফসল হয়ে উঠছে।"
ফুল থেকে ডাল-সবই বিক্রি:
শুধু সজনে ডাল নয়, এখন ফুল, পাতা-সবকিছুরই চাহিদা রয়েছে বাজারে। ফলে একটি গাছ থেকেই একাধিকভাবে আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
তরুণ কৃষক মামুন বলেন, "একটা গাছ থেকেই তিনভাবে আয়-ফুল, পাতা আর ডাল। তাই এখন অনেকেই নতুন করে গাছ লাগাচ্ছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, সজিনা চাষে তেমন কোনো ঝামেলা নেই। একটি ডাল মাটিতে পুঁতলেই সহজেই গাছ হয়ে যায় এবং অল্প পরিচর্যাতেই ভালো ফলন দেয়।
কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "ধান বা অন্য ফসলের মতো খরচ নেই। সজিনা লাগিয়ে বসে থাকলেই ফলন পাওয়া যায়। তাই এখন অনেকেই চাষ শুরু করেছে।"
একজন তরুণ কৃষক হাসান বলেন, "বেকার ছিলাম। এখন সজিনা বিক্রি করে নিজের খরচ চালাতে পারছি। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনা আছে।”