খলিশা, গরান, পশুরসহ নানা ফুলে সেজে ওঠা সুন্দরবনের বুকজুড়ে যখন মধুর মৌসুমের আহ্বান, ঠিক সেই সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বুধবার (১ এপ্রিল) শুরু হয়েছে মধু আহরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। প্রকৃতির এই প্রাচুর্যের মাঝেও উপকূলের মৌয়াল পরিবারগুলোর মনে নেই সেই পুরনো স্বস্তি - বরং আছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াই।
সাতক্ষীরা রেঞ্জসংলগ্ন শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জের চরে চরে ঘুরলে চোখে পড়ে অন্য এক বাস্তবতা। নদীর ধারে নৌকা বাঁধা, জাল শুকানো, মৌচাক কাটার সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা - সবই প্রস্তুত, কিন্তু মানুষের চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। যেন প্রতিটি প্রস্তুতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে অজানা আশঙ্কা। একজন মৌয়াল পরিবারের সদস্যের মতো করেই বলতে হয় - এই বনই আমাদের জীবন, এই বনই আমাদের ভয়। আগে বাঘের গর্জন, নদীতে কুমির - এসব ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও সাহস করে যেতাম। কারণ জানতাম, জীবন নিয়ে ফিরতে পারলে ঘরে ফিরবে অন্ন। কিন্তু এখন সেই সাহসটুকুও ভেঙে দিচ্ছে বনদস্যুদের ভয়।
স্থানীয় মৌয়ালরা জানান, সুন্দরবনের গভীরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি দস্যু চক্র। তারা বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করছে। টাকা দিতে না পারলে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই এবার মধু আহরণে যেতে চাইছেন না।
গাবুরা ইউনিয়নের এক মৌয়াল বলেন, বনে গেলে এখন বাঘের ভয় কম, দস্যুর ভয় বেশি। বাঘ মারলে একবারেই শেষ, কিন্তু দস্যুরা ধরে নিয়ে গেলে পরিবারটাও শেষ হয়ে যায়। মৌখালী গ্রামের অভিজ্ঞ মৌয়াল আক্কাস আলীর কণ্ঠে হতাশা, বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে চাই না। কিন্তু পরিবারের মুখের দিকে তাকালে ভয় লাগে। আগে নির্বিঘ্নে মধু তুলেছি, এখন মনে হয় - ফিরতে পারব তো?
এই অঞ্চলের অধিকাংশ মৌয়াল পরিবার দাদন বা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মৌসুম শুরু করে। মধু সংগ্রহ করে সেই ঋণ শোধ করাই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বনদস্যুদের কবলে পড়লে মুক্তিপণ দিতে গিয়ে তারা হয়ে পড়েন নিঃস্ব। অনেক পরিবার এখন ঋণের বোঝা বইতে না পেরে বিকল্প পেশার কথা ভাবছে। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, আগে মৌয়ালরা বাঘ-কুমিরকে তেমন ভয় পেত না। এখন বনদস্যু আতঙ্কে অনেকেই বনে যাচ্ছে না। অনেকে দিনমজুরির কাজ বেছে নিচ্ছে।
এদিকে বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মধু আহরণ মৌসুম দুই মাস চলবে। সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও মধু আহরণের পরিমাণে ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২১ সালে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। একই সঙ্গে কমেছে মৌয়ালের সংখ্যাও - ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫ হাজারে। মৌয়ালরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয় - স্থায়ীভাবে বনদস্যু নির্মূল না হলে তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে না। তারা নিরাপত্তা জোরদারসহ কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
তবে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে তাই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় - এই বন কি শুধু সম্পদের উৎসই থাকবে, নাকি এখানে বসবাস করা মানুষগুলোর নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তাও মিলবে?