যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে কোনও অপরিণামদর্শী যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু দ্বিতীয়বার মার্কিন মসনদে বসার পর বছর ঘুরতেই তার ঠিক বিপরীত কাজ করে বসলেন তিনি। জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের উসকানিতে ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দিলেন ট্রাম্প।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হামলাতে প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, কিন্তু তাতে ইরানে সরকার পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি তো তৈরি হয়ইনি। উল্টো এখন মার্কিন সামরিক শক্তির গোমর ফাঁস হওয়ার উপক্রম।
মার্কিন হামলায় সর্বোচ্চ নেতাসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার নিহতের পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যকেই যুদ্ধে টেনেছে ইরান। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে তারা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তাণ্ডবে প্রায় এক মাস ধরে শুধু আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে আসা-যাওয়া করছেন ইসরায়েলিরা। দেশটির তেল আবিব, জেরুজালেম, দিমোনা, এইলাত, হাইফার মতো শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র চালানো হয়েছে।
আর যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ১৯টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ভয়ে এখন আর কোনও জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করছে না। প্রণালির দুই পাশে হাজারও জাহাজ আটকে আছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার জেরে তেল-গ্যাসের দাম তরতরিয়ে বাড়ছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে তো ‘জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ও ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া এবং ইরানের তেলের ওপর থেকে ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিষয়টিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছেন।
আর বৃহত্তর অর্থেও ইরান যুদ্ধে অনেকটাই যেন কৌশলগত পরাজয়ের পথেই হাঁটছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানে শত শত টমাহক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান দিয়ে তেহরান-ইসফাহানের মতো শহরগুলোতে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধে তাদের সঙ্গী ইসরায়েল একের পর এক ইরানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করছে।
কিন্তু এতকিছুর পরও ইরানকে দমানো যায়নি। এখনও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলছেই। আর হরমুজ প্রণালিতে ছড়ি ঘুরিয়ে যুদ্ধের লাগামই এখন নিজেদের হাতে রেখেছে ইরান।
ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস ও দেশটির শাসন কাঠামো পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু সে পথে মার্কিনিরা এক মাসে কতদূর এগিয়েছে? এই প্রশ্নের সহজ জবাব–৪৫০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনও ইরানের হাতেই রয়েছে। আর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিহত আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তারই ছেলে মোজতবা খামেনি। যার অর্থ, প্রধান দুই লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র অসফল।
উল্টো হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন যুক্তরাষ্ট্র। মুখে আস্ফালন করলেও এক হরমুজ প্রণালিকেই এখনও ‘নিরাপদ’ করতে পারছে না তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। হরমুজ প্রণালিতে মিত্রদের ওপর সুর চড়িয়েও কাজ হয়নি। তারা এ যাত্রায় মার্কিন-ইসরায়েলের ‘আরোপিত’ যুদ্ধের ভাগীদার হতে চায় না।
এদিকে ইরান যুদ্ধের ফলে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারেও টান পড়েছে। থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত ফুরিয়ে যাওয়ার পথে। এসব অস্ত্রশস্ত্রের মজুত যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন মার্কিন সমর বিশ্লেষকরা।
শুধু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেই অবশ্য ক্ষান্ত হয়নি ইরান। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ বাব আল মানদেবও এখন বন্ধের পথে। কারণ ইরানের পক্ষে শনিবার (২৮ মার্চ) ইসরায়েলে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। তারা যেকোনও সময় বাব আল মানদেবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এমনটা হলে সুয়েজ খালেও জাহাজ চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। তাতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এই কারণে প্রণালিগুলোই এখন যুদ্ধে ইরানের প্রধান কৌশলগত ‘অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে। তাই যুদ্ধ থামাতে এখন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যেহেতু সরাসরি তাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয়, তাই পাকিস্তান, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের মাধ্যমে এই আলোচনা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে দেশটি।
আর তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি হওয়ার পরও ইরান যুদ্ধের বেসামাল পরিস্থিতির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সব ধরনের সংকট যে শুধুই অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে সমাধান করা যায় না, সেটা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে দেশটি।
শুধু তাই নয়, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সংকট এবং ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ইরান যুদ্ধ। ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোন ঠেকাতে কোটি কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার বিষয়টি নেটিজেনদের হাসির খোরাক জুগিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরীর বহর দিয়ে এতদিন মার্কিনিরা বড়াই করলেও ইরানে অভিযান চালাতে গিয়ে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের ফিরে যাওয়া ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
চীন-রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা যে এসব জিনিস টুকে রাখছে, তা বলাই বাহুল্য। তাই বিশ্লেষকরা প্রশ্ন রাখছেন, ইরানে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে উল্টো কি ‘গোমর ফাঁস’ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের?