বসন্তের মাতাল হাওয়ায় যখন শহরজুড়ে লাল গোলাপের ছড়াছড়ি, তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাতাসে ভেসে আসছে সুন্দরী-গেওয়ার ঘ্রাণ।
১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। তবে উপকূলের মানুষের কাছে এই দিনটির মাহাত্ম্য ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে ভালোবাসার উৎসব চললেও খুলনাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে আজ পালিত হচ্ছে ২৫তম 'সুন্দরবন দিবস'।
জোয়ার উঠলেই বুক ধড়ফড়, ভাটা নামলেই খানিকটা স্বস্তি-এই দোলাচলেই কয়রার জীবন। ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবসে উপকূলের মানুষ এককণ্ঠে কইল,
"বন বাঁচাইলে বাঁধ টিকবো, বাঁধ টিকলে মানুষ টিকবো।”
প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন ঘিরে দিনভর কর্মসূচিতে ভেসে উঠল বাঁচা-মরার এই হিসাব-বন মানে নিরাপত্তা, বন মানে জীবিকা, বন মানে ভবিষ্যৎ। বনের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দুই দশক আগে শুরু হয়েছিল এই দিবসটি। ২০০১ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সুন্দরবন দিবস ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতিবছর বনসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষেরা দাবি জানিয়ে আসছেন-দিবসটি যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়।
র্্যালী-মানববন্ধন: "বনডা আমাগো ঢাল"
সকাল থেইকা কয়রার বিভিন্ন ইউনিয়নে আলোচনা, বৃক্ষরোপণ আর সচেতনতা র্যালি। বাজারঘাটে মাইকিং-"অবৈধ কাটাকাটি বন্ধ করেন, বন বাঁচান।” স্কুল-কলেজের পোলাপান প্ল্যাকার্ড ধরছে-“বন রক্ষা, উপকূল রক্ষা।” স্থানীয়দের ভাষায়, ঝড় আইলে আগে বুক দিয়া ধাক্কা খায় বন, পরে বাঁধ। তাই বন থাকলে ক্ষতি কমে, ভিটা বাঁচে।
সরেজমিনে কথা হয়, কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীর চরে রহমান আলীর পরিবার। পেশায় জেলে, ফাঁকে ফাঁকে মৌয়ালদের সঙ্গে বনেও যান। ২০২০-এর বড় ঝড়ে (স্থানীয়দের ভাষায় “ওই ঝড়”) তাদের কাঁচা ঘর ভাঙে, তবে পাশের বনপট্টি থাকায় ঢেউয়ের তেজ কমে-এমনটাই বললেন রহমান আলী।
"বন থাকলে ঢেউ আগে ওডারেই লাগে, আমাগো দিকে আইতে আইতে জোর কমে। বনডা না থাকলে এই ভিটা থাকত না।" তার স্ত্রী রোজিনা বেগম যোগ করলেন, লবণাক্ত পানিতে চাষ হয় না; সুপেয় পানির জন্য দূর হাটতে হয়। "বাঁধ মজবুত না হইলে সবই শেষ,”-বললেন তিনি। পরিবারটির দাবি-টেকসই বেড়িবাঁধ, নলকূপে লবণযুক্ত পানি, আর কাছে ভালো চিকিৎসা।
সরেজমিনে উপকূলের এক স্কুলের পাঠ
কয়রা উপজেলার উপকূলঘেঁষা সুন্দরবন বালিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আজ ছিল ব্যতিক্রমী ক্লাস-'বন ও দুর্যোগ' শিরোনামে উন্মুক্ত পাঠ। শিক্ষক বললেন, “বন কমলে ঝড়ের ধাক্কা বাড়ে-এইটা বইয়ের কথা না, আমাদের জীবনের কথা।”
শিক্ষার্থীরা দেয়ালপত্রিকায় লিখেছে-"বন রক্ষা, ভবিষ্যৎ রক্ষা।” দশম শ্রেণির আনিকা তাবাচ্ছুমের ভাষায়,
"আমাগো গ্রাম বাঁচাইতে হইলে আগে বন বাঁচাইতে হইবো। উন্নয়ন চাই, কিন্তু বনের লগে মিলাইয়া।"
দাবি-দাওয়া: বাঁধ, পানি, চিকিৎসা-তিন অগ্রাধিকার
সমাবেশে উঠে আসে দীর্ঘদিনের চাহিদা-
১) টেকসই বেড়িবাঁধ: ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বারবার ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী নকশা।
২)সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান: লবণাক্ততা মোকাবিলায় গভীর নলকূপ/পরিশোধন ব্যবস্থা।
৩)উন্নত চিকিৎসাসেবা: উপকূলে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপন।
তরুণদের শপথ: "বন রক্ষা, ভবিষ্যৎ রক্ষা"
শিক্ষার্থীরা কইল, বন সংরক্ষণে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ বাড়াইতে হইবো। প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, নিয়মিত বৃক্ষরোপণ, আর সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতা-এই তিনটা কাজে এগাইতে চায় তারা।
কোট বক্স
“বন বাঁচলে বাঁধ টিকবো, বাঁধ টিকলে মানুষ টিকবো-এইডাই উপকূলের অঙ্ক।”
-স্থানীয় পরিবেশকর্মী
তথ্যবক্স:
ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা আগে নেয় বন
জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় জীবিকার ভরসা
নদীভাঙন-লবণাক্ততা সামলাইতে প্রাকৃতিক সহায়
উপকূলের হাহাকার
কয়রা উপজেলার উপকূলীয় বাসিন্দা বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, "শহরের মানুষ আজ প্রিয়জনকে ফুল দেয়, আর আমরা সুন্দরবনের কাছে আমাদের জীবন ভিক্ষা চাই। এই বন না থাকলে জলোচ্ছ্বাসে আমাদের অস্তিত্ব থাকত না। বন আমাদের বাঁচায়, কিন্তু আমরা কি বনকে বাঁচাতে পারছি?"
পরিবেশবাদীদের মতে, সুন্দরবনকে রক্ষা করা মানে কেবল কয়েকটা গাছ রক্ষা করা নয়, বরং বাংলাদেশের মানচিত্রকে সুরক্ষিত রাখা। সুন্দরবন দিবসের এবারের স্লোগান- 'সুন্দরবনকে ভালোবাসুন, নিজেকে বাঁচান'।
সুন্দরবন এক নজরে
আয়তন: ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশ অংশ)।
বিশ্ব ঐতিহ্য: ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি।
জীববৈচিত্র্য: ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৩৫৫ প্রজাতির পাখি।
দিবসের শুরু: ২০০১ সাল থেকে পরিবেশবাদীদের উদ্যোগে।
গবেষক অধ্যাপক আ ব ম আব্দুল মালেক বলেন, সুন্দরবন প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে। জোয়ারভাটা না হলে সুন্দরবন বাঁচবে না। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার ভাষায় একে বলে জুগার পানি। সুন্দরবনের গাছপালা মাতৃগর্ভে অঙ্কুরোদগম হয়।
সুন্দরবনকে 'ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট' বা লবণাক্ত জলাভূমির বনও বলা হয়। আমাদের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি রক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীর একক বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনের গুরুত্ব অপরিসীম। ম্যানগোভ হলো একটি বিশেষ ধরনের বন। এ বন সৃষ্টি হয় নোনা ও মিঠা পানির মিলিত প্রবাহের এলাকায়। তবে সে পানির মাত্রা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকলেই এমন বন গড়ে উঠতে পারে। সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর। এ বনের গহীন নির্জন অরণ্যের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে সুন্দরী ও গোলপাতা গাছের সারি।
সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে নানারকম পাখি ও জীবজন্ত বসবাস করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, বন্যশুকর, সজারুসহ প্রায় ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এগুলো আমাদের সম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এরা সহায়ক। সুন্দরবনের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি পাক। সুন্দরবনকে ভালোবাসুন। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে আমাদের ভালোবাসার বিষয় হোক সুন্দরবন। সুন্দর মন ও বনের সৌন্দর্য দেখে কাটুক প্রতিদিন।
যদিও এটি সরকারিভাবে জাতীয় দিবসের স্বীকৃতি পায়নি, তবুও উপকূলীয় ১৭টি উপজেলায় আজ পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। বর্ণাঢ্য র ্যালি, মানববন্ধন আর শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ফুটে উঠছে বনের আর্তনাদ। আয়োজকদের দাবি শুধু একদিনের লোকদেখানো ভালোবাসা নয়, সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োেগ।
দিনের শেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়-লাল গোলাপের এই দিনে প্রিয়তমার পাশাপাশি প্রকৃতির এই পরম বন্ধুটির জন্য আমাদের ভালোবাসা কতটুকু?
“সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ফুসফুস। একে ধ্বংস করা মানে নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করা।"