খুলনার কয়রায় উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই সুপেয় পানি ও মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। এতে করে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে উপজেলার হাজার হাজার শিক্ষার্থী। শিশুর মানসিক বিকাশেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন পরিবেশ। অনেক বিদ্যালয়ে গভীর নলকূপ থাকলেও নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। শিশু শিক্ষার্থীরা তৃষ্ণা মেটাতে বিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে পানি পান করে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভোগান্তির পাশাপাশি এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে উপজেলার ২২ হাজার শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে যায়, কয়রায় শিক্ষাপ্রদানের মানে ঊর্ধ্বগতি থাকলেও অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নেই মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। অনেক প্রতিষ্ঠানের টয়লেটগুলো পুরানো হওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় পরিচ্ছন্নও রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে টিউবয়েল না থাকায় পানির জন্য নদী কিংবা পুকুরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে করে মেধা বিকাশের সুষ্ঠু পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলার সবকয়টি ইউনিয়নে আর্সেনিক, মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি হওয়া এবং কোনো কোনো বিদ্যালয়ের নলকূপ নষ্ট বা চুরি হয়ে যাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পানির তৃষ্ণা মেটাতে বিদ্যালয়সংলগ্ন বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে পানি পান করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অনেক সময় অনিরাপদ উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে তারা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ৬৫ টিতে গভীর নলকূপ বসানো থাকলেও অধিকাংশই এখন অকেজো। বাকি ৫০টিতে কোন টিউবওয়েলই নাই। ১৭টি আছে তাতে আর্সেনিক, আয়রন ও লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। ২৫ টি বিদ্যালয়ে স্বল্প ধারণক্ষমতার ট্যাংকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হলেও চাহিদা পূরণ হয় না।
এসব বিদ্যালয়ে ২২ হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। সূত্র জানায়, সব বিদ্যালয়ে গভীর নলকূপ বসানো হয়েছিল, যার অনেকগুলোই ব্যবহারের অভাবে বিকল হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কিছু বিদ্যালয়ের নলকূপের ওপরের পাম্প চুরি হয়ে গেছে। নতুন করে ২৯টি ওয়াশব্লক ও ২৫টি ডিপটিউবওয়েল বসানোর কাজ চলমান আছে।
- উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা মহেশ্বীপুর, বাগালি, দক্ষিণবেদকাশি, মহারাজপুর, সদরের অর্ধেক, উত্তর বেদকাশির অর্ধেকসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপ বসালেও পানি খাওয়ার উপযুক্ত হয় না। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে লবণের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ১৫০-৬০০ মিলিগ্রাম। তবে কয়রার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে প্রতি লিটারে তিন-চার হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যার ফলে স্কুলে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে নলকূপের প্লাটফѓম আছে, কিন্তু হ্যান্ডযুক্ত পাম্প নেই। আবার নলকূপ আছে, কিন্তু পানি ওঠে না। অনেকগুলো নলকূপ একেবারে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু বিদ্যালয়ে কয়েকটি নলকূপের চিহ্ন থাকলেও পানি উঠানোর মত সচল কোন নলকূপ নেই। শিক্ষার্থীদের পানি পিপাসা পেলে আশ পাশের লোকজনের বাড়িতে গিয়ে পানি পান করতে হয়। আবার শিক্ষকদের পানির প্রয়োজন হলে অন্যের বাড়ি থেকে পানি সংগ্রহ করেন। তবুও নলকূপ মেরামতের নেই কোন উদ্যোগ। এছাড়াও জরুরী টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকরাও । বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পানির এসব সংকটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেছেন বলে জানান।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, উপজেলায় কয়েক হাজার পানি ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে। যা টাকা বিনিময়ে বিত্তশালীরা ও রাজনৈতিক নেতারা ওই ট্যাংকি পেয়েছেন। অথচ কোমল মতি শিশুরা যে দীর্ঘদিন সুপেয় পানি কষ্টে স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে রয়েছে তাতে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। নেই - কোন যথাযথ উদ্যোগ। তারা দ্রুত - শিশুদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত - করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, বিদ্যালয়ে পানি সমস্যা দীর্ঘ দিনের। লবণাক্ত অঞ্চল হওয়ায় টিউবওয়ে লবণ ও আয়রণের পরিমাণ বেশি থাকে বলে পানি পান করা যায় না। আমরা সুপেয় পানি জন্য বিকল্প ভাবছি এ ব্যাপারে আমরা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেছি। ওয়াশব্লকের কাজ চলমান আছে কয়েকটি বিদ্যালয়ে। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইসতিয়াক আহম্মেদ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ১৫০-৬০০ মিলিগ্রাম। তবে কয়রার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে প্রতি লিটারে তিন-চার হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যার ফলে স্কুলে টিউবওয়েলে পানি পান করা যায় না।